• রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:৩৮ অপরাহ্ন

নতুন মুদ্রানীতি, আরো বাড়ছে ঋণের সুদহার

Avatar photo
ইকোনমি বিডি
আপডেট: সোমবার, ১৫ জুলাই, ২০২৪

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে নানা উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। বাড়ানো হয়েছিল ঋণের সুদহার। ব্যাংক ঋণের সুদহার সর্বোচ্চ ৯ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশের কাছাকাছি উঠে। এরপরও তেমন সুফল পাওয়া যায়নি। কমেনি মূল্যস্ফীতি, উল্টো নিত্যপ্রয়োজনীয় সব পণ্যের দাম বাড়ে।

এ অবস্থায় ঋণের সুদহার আরো বাড়াতে পারে বাংলাদেশ ব্যাংক। চলতি ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতিতে এই সুদহার বৃদ্ধির ঘোষণা আসতে পারে। এতে বাড়তে পারে নীতি সুদহারও (রেপো রেট)।

বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো যে সুদহারে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে অর্থ ধার করে সেটিই নীতি সুদহার। এ সুদহার বাড়লে ব্যাংক ঋণের সুদও বাড়ে। বর্তমানে নীতি সুদহার ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ। সেক্ষেত্রে নীতি সুদহার বাড়তে পারে ৫০ বেসিস পয়েন্ট। তবে এটি কার্যকর হতে পারে দুই ধাপে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুদ্রানীতি কমিটির সভা রোববার অনুষ্ঠিত হয়। গভর্নর আব্দুর রউফ তালুকদারের সভাপতিত্বে সভায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরের মুদ্রানীতির খসড়া পাস হয়েছে। সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্ষদ সভায় নতুন মুদ্রানীতি পাস হবে। পরে ১৮ জুলাই তা ঘোষণা করা হবে।

বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, গত দুই অর্থবছরের মতো চলতি অর্থবছরের মুদ্রানীতিও হবে ‘সতর্ক’ ও ‘সংকুলানমুখী’। মূল্যস্ফীতির লাগাম টানতে বাজারে নিয়ন্ত্রণ করা হবে অর্থের প্রবাহ।

গত দুই অর্থবছরজুড়েই দেশে ৯ শতাংশের বেশি মূল্যস্ফীতি বিরাজ করছে। সবশেষ ২০২৩-২৪ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ। যদিও সে হার ৬ শতাংশে নামিয়ে আনার কথা বলেছিল বাংলাদেশ ব্যাংক। এর জন্য ব্যাংক ঋণের সর্বোচ্চ সুদহার ৯ শতাংশের সীমাও তুলে নেয়া হয়। একই সঙ্গে দফায় দফায় বাড়ানো হয় নীতি সুদহার।

এ পরিপ্রেক্ষিতে গত অর্থবছরের মধ্যেই ঋণের সুদহার ৯ থেকে বেড়ে প্রায় ১৫ শতাংশে ঠেকে। যদিও সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব এখনো মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে দৃশ্যমান হয়নি। সর্বশেষ জুনে দেশের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৯ দশমিক ৭২ শতাংশ।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, টানা ১৬ মাস ধরে মূল্যস্ফীতির হার ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে। অর্থনীতিবিদরা যদিও বলছেন, বিবিএসের তথ্যের চেয়ে দেশের প্রকৃত মূল্যস্ফীতি আরো অনেক বেশি। প্রকৃত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাবায়ন না করায় মূলত এর সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে না।

এদিকে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে প্রতিবেশী প্রায় সব দেশেই মূল্যস্ফীতি বাড়লেও সাম্প্রতিক সময়ে তা কমে এসেছে। এক বছর ধরে ভারতের মূল্যস্ফীতির হার ৬ শতাংশের নিচে রয়েছে। সর্বশেষ জুনেও প্রতিবেশী দেশটির মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের সাফল্য পেয়েছে পাকিস্তান ও শ্রীলংকা। ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে পাকিস্তানের মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৩১ শতাংশের বেশি। চলতি বছরের জুনে এসে সে হার ১২ দশমিক ৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি প্রায় ৫২ শতাংশে উঠলেও বর্তমানে তা ১ শতাংশেরও কম। চলতি বছরের মে মাসে শ্রীলংকার মূল্যস্ফীতি ছিল দশমিক ৯ শতাংশ।

মূল্যস্ফীতি কমাতে ঋণের সুদহার বৃদ্ধির প্রভাব দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের ওপর পড়েছে। উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় বাজারে পণ্যের দাম আরো বাড়ছে। আবার ব্যবসায়িক মন্দা ও সুদহার বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংক ঋণ পরিশোধ করতে পারছেন না। এতে ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ও হার দুটিই বাড়ছে।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সুদহার বৃদ্ধির প্রভাবে অনেক ব্যবসায়ী দেউলিয়া হওয়ার মুখে। এ অবস্থায় ঋণের সুদহার বাড়লে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে। ব্যবসায়ীদের শীর্ষ সংগঠন দ্য ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) সভাপতি মো. মাহবুবুল আলম বলেন, সুদহার এমনিতেই অনেক বেড়ে গেছে। আশা করছি, ঋণের সুদ আর বাড়বে না। গভর্নরের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আমাদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো এখন সাড়ে ১৩ থেকে ১৪ শতাংশ সুদে ঋণ দিচ্ছে বলে আমাদের কাছে তথ্য আছে। কোনো ব্যাংক এর চেয়ে বেশি সুদ নিলে আমরা বাংলাদেশ ব্যাংক ও সরকারের কাছে অভিযোগ করব।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই বছর ধরে দেশের ব্যাংক খাতে তারল্যের সংকট চলছে। ব্যাংকগুলো উচ্চ হারে সুদ দিয়েও আমানত সংগ্রহ করতে পারছে না। সংকট তীব্র হওয়ায় দেশের অন্তত এক ডজন ব্যাংক তারল্যের জন্য কেন্দ্রীয় ব্যাংকনির্ভর হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক টাকা ছাপিয়েও কিছু ব্যাংককে নগদ অর্থের জোগান দিচ্ছে। আবার সরকারও ঘাটতি বাজেট পূরণে পুরোপুরি ব্যাংক ঋণনির্ভর হয়ে পড়েছে। এ পরিস্থিতিতে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বেসরকারি খাতে পর্যাপ্ত ঋণের জোগান নিশ্চিত করাও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দেখা দিয়েছে।

সরকার ২০২৪-২৫ অর্থবছরের জন্য ২ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি বাজেট ঘোষণা করেছে। এ ঘাটতি পূরণে ১ লাখ ৬০ হাজার ৯০০ কোটি টাকার ঋণ নেয়া হবে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে। এক্ষেত্রে দেশের ব্যাংক খাত থেকে নেয়া হবে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ঋণ। যদিও অর্থবছর শেষে ব্যাংক খাত থেকে নেয়া ঋণের পরিমাণ আরো বাড়তে পারে।

এ খাত সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, পরিস্থিতিতে সরকারকে ঋণের জোগান দিতে গিয়ে বেসরকারি খাতের আরো বেশি ঋণবঞ্চিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে সরকারি ট্রেজারি বিলের সুদহার উঠেছে ১১ দশমিক ৮০ শতাংশে। ব্যাংকগুলো এখন সরকারকে ঋণ দেওয়াকেই বেশি লাভজনক ও নিরাপদ মনে করছে। চলতি অর্থবছরে ট্রেজারি বিল ও বন্ডের সুদহার আরো বাড়বে।


আরও

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০