প্রতিবছর দেশ থেকে বিপুল কর্মী বিদেশে যান। তারা কঠোর পরিশ্রম করে অর্জন করেন মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু বৈধ পথে সে অর্থ দেশে না আসলে তা অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর পরিণতি বয়ে আনে। বর্তমানে দেশে যে পরিমাণ রেমিটেন্স বা প্রবাসী আয় আসে তার সমপরিমাণ হুন্ডিতে পাচার হয়ে যায়। এটি বন্ধ হলে বছরে প্রায় ৫০ বিলিয়ন ডলার দেশের রিজার্ভে যোগ হবে। কিন্তু নানা কারণে হোন্ডি থামছে না। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে সংসদীয় কমিটি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায় বৈধ পথে রেমিটেন্স পাঠাতে সচেতনতা বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের সুপারিশ করেছে প্রবাসী কল্যাণ ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। দেশে রেমিটেন্স প্রবাহ বাড়াতে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে করণীয় নির্ধারণের সুপারিশও করেছে ওই কমিটি। বর্তমানে সংসদ বিলুপ্ত হয়ে গেছে, তবে হুন্ডি থামাতে এ বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন অর্থনীতিবিদরা।
প্রতিবেদনে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স আসার ক্ষেত্রে দশটি প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কারণগুলো হল বৈধ পথের তুলনায় অবৈধ পথে রেমিটেন্স এর বিনিময় হারের বেশ ফারাক, প্রবাসী কর্মীর বৈধ কাগজপত্র না থাকা, প্রবাসে বাংলাদেশী বাণিজ্যিক ব্যাংকের শাখা না থাকা বা পর্যাপ্ত শাখার অভাব, এছাড়া বাংলাদেশি মানি এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠান না থাকা বা পর্যাপ্ত মানি এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট না থাকা। রেমিটেন্স প্রেরণে উচ্চ ফি বা সার্ভিস চার্জ এবং রেমিট্যান্স পাঠানোর নির্ধারিত সীমা। এছাড়া হুন্ডি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম, অনেক ক্ষেত্রে প্রবাসীদের বা প্রবাসীদের রিপোর্ট আত্মীয়দের দেশে ব্যাংক একাউন্ট না থাকা, আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হলে রেমিটেন্স প্রেরণে প্রতিবন্ধকতা, অননুমোদিত ব্যবসা বা কাজের আয় বৈধ পথে প্রেরণের সুযোগ না থাকা এবং বৈধ পথে রেমিটেন্স প্রেরণের সচেতনতার অভাব।
প্রতিবেদনে বিদেশগামী জনবল কে সময়োপযোগী প্রশিক্ষণ প্রদান, ঋণ প্রাপ্তিতে সহায়তা এবং বিদেশের শ্রমিক মৃত্যুজনিত সমস্যা নিরসনের জন্য সর্বোচ্চ সেবা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। সেই সঙ্গে বিদেশে জনশক্তি প্রেরণে নতুন নতুন শ্রমবাজার অন্বেষণ এবং অভিবাসন সংক্রান্ত নীতিমালা অনুযায়ী বিশ্বের সব শ্রম ও চাহিদার দেশে যুক্তিসংগত বা প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে বিনা অভিবাসন ব্যয়ে জনশক্তি পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণেরও অনুরোধ করা হয়।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সূত্র বলছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে রেমিটেন্স। প্রবাসী আয়ের প্রবাহ বৃদ্ধির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে রিজার্ভের ধারাবাহিক পতন থেমেছে। খাত সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে প্রবাসীরা যে পরিমাণ অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন তার অন্তত ৯০ শতাংশ বৈধ পথে আনতে পারলে রেমিটেন্স প্রবাহে জোয়ার সৃষ্টি হবে। এর প্রভাবে বৈদেশিক মুদ্রা বাজার ও রিজার্ভ ইতিবাচক ধারায় ফিরবে।
জানতে চাইলে সিপিডির বিশেষ ফেলো ডক্টর মুস্তাফিজুর রহমান বলেন, ব্যাংকগুলোর উচিত তাদের বিদেশি এক্সচেঞ্জ হাউজগুলোতে সেবার মান আরো বৃদ্ধি করা। ছুটির দিনেও যাতে প্রবাসীরা রেমিটেন্স পাঠাতে পারে সে ব্যবস্থা রাখতে হবে। অনেক সময় প্রবাসীরা কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে ব্যাংকিং সময় শেষ হয়ে যায়, সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা রাখা প্রয়োজন। যাতে প্রবাসীদের সুবিধামতো তারা বিদেশ থেকে অর্থ পাঠাতে পারে এবং দেশে পৌঁছানোর পর সে অর্থ দ্রুততার সঙ্গে তাদের পরিবারের কাছে পৌঁছে যায়।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হুন্ডি এবং অন্যান্য মাধ্যমে রেমিটেন্স বড় অংকই পাচার হয়ে যাচ্ছে, যার বাৎসরিক পরিমাণ অন্তত ২৫ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রবাসীদের দেশে পাঠানো রেমিটেন্সের অর্ধেকই পাচার হয়ে যাচ্ছে। এ প্রসঙ্গে সরকারি কোন আনুষ্ঠানিক ঘোষণা কিংবা লিখিত হিসাব নেই। তবে সাবেক অর্থমন্ত্রী আহম ও মোস্তফা কামাল আলোচনায় বলেছিলেন আমাদের সম্ভাব্য বা প্রাক্ষোলিত প্রবাসী আয়ের মাত্র ৫১ শতাংশ আসে বৈধ পথে, আর বাকিটা হুন্ডি হয়ে যায়। এটি বিবেচনায় নিয়ে বর্তমানে আসা রেমিট্যান্সের শতভাগ ব্যাংকে আসলে এর অঙ্ক দাঁড়াবে ৫০ বিলিয়ন ডলার।
কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংশ্লিষ্টরা জানান, অনেক কর্মী বিদেশে পাঠানোর সময় সাপেক্ষ হলেও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের মাধ্যমে পাচার বন্ধ করে রেমিটেন্সে জোয়ার সৃষ্টি করা সম্ভব। এতে চলমান ডলার সংকট ও রিজার্ভের পতন তড়িৎ গতিতে নিয়ন্ত্রণে আসবে। তাই এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সরকারের বিভিন্ন দপ্তর, বিদেশী অবস্থানরত দূতাবাস এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বৈধ পথে প্রবাসী আয় আনতে বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোকে আরো তৎপরতা দেখাতে হবে। এ কাজে বিশ্বব্যাংকের সহায়তা নেওয়া যেতে পারে। হুন্ডিকে চতুরভাবে উৎসাহিত করার কাজে যুক্ত কিছু বাণিজ্যিক ব্যাংক বা তাদের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। রপ্তানি আয় দ্রুত প্রত্যাবাসনসহ বাজারে ডলারের যোগান বাড়াতে হবে এবং বিনিময় হারের স্থিতিশীলতা ধরে রাখতে হবে।
গত বছরের শেষের দিকে অর্থ পাচারের নতুন গন্তব্য খুঁজে পায় বাংলাদেশ ব্যাংক। ইউরোপের দেশ পর্তুগালে অর্থ পাচারের ঘাঁটি গেড়েছে বাংলাদেশের আড়াই হাজার নাগরিকের একটি বিশাল চক্র। নিরাপদে অর্থ সরিয়ে নিতে তারা দেশটির নাগরিকত্ব নিয়েছেন। ইতোমধ্যে দেশটিতে সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের দুবাইয়ের পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ। বর্তমানে পাচারের প্রধান রুট হিসেবে দেশটি ব্যবহৃত হচ্ছে। পাচারকার্য পরিচালনার জন্য দুবাইয়ের ১৩ হাজার প্রতিষ্ঠান খুলেছে বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। সেখানে বিনিয়োগ করা হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। রাজনীতিবিদ ও আমলাদের অর্থপাচারের বাহক হিসেবে কাজ করছে ব্যবসায়িক গোষ্ঠীগুলো। আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাবশালীদের প্রশ্রয়ে আমদানি রপ্তানির আড়ালে এবং হুন্ডি মাধ্যমে বিপুল অর্থ পাচার করে বিদেশে বিশাল সাম্রাজ্য করেছে কয়েকটি শিল্প গ্রুপ।