বেসরকারি পর্যায়ের শীর্ষ ব্যাংক ‘ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্যাংকটি সাধারণ গ্রাহক থেকে শুরু করে শীর্ষব্যবসায়ী ও আমানতকারীদের আস্থার প্রতীকে রূপ নেয়। ব্যাংকিং সেক্টরে সুনামের সঙ্গে কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি এই ব্যাংকটি শিক্ষা-চিকিৎসা সহ নানা সামাজিক ও সেবামূলক কাজ করে দেশে সব শ্রেনী-পেশার মানুষের হৃদয়ে স্থান করে নিয়েছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এই ব্যাংকটির ওপর কু-নজর দেওয়া শুরু করে চট্টগ্রামভিত্তিক ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এম আলম গ্রুপ। এই গ্রুপটি ইসলামী ব্যাংক দখলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা হাতে নেয়। এক পর্যায়ে ২০১৭ সালের ৫ জানুয়ারি তারা সফল হয়। ওইদিন ব্যাংকটির তৎকালীন বৈধ চেয়ারম্যান মুস্তাফা আনোয়ারকে সরিয়ে পরিচালনা পর্ষদের প্রথম সভায় চেয়ারম্যান করা হয় আরাস্তু খানকে। ওই সময় তৎকালীন এমডি মোহাম্মদ আবদুল মান্নানকে সরিয়ে দিয়ে নতুন এমডি করা হয়েছিল আবদুল হামিদ মিঞাকে। আর এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ব্যাংকটি দখলে নেয় এস আলম গ্রুপ।
ইসলামী ব্যাংকের মালিকানা জবরদখলের পর থেকে থাকেনি এস আলম ও তার সহযোগিরা। ব্যাংকিং সেক্টরে নেতৃত্ব দেওয়া শক্তিশালী এই ব্যাংক ধ্বংসের অপকৌশল আঁকতে শুরু করে। সেই ধরারাবাহিকতায় ব্যাংকের সেবার মান জলাঞ্জলি দিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ার পটিয়া পরচয়ে দোকানদার, বাড়ির কাজের বুয়া, অটো চালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী ও সাম্পানের রংমিস্ত্রীসহ কয়েক হাজার অদক্ষ, অশিক্ষিত ও অর্ধশিক্ষিত লোক অবৈধভাবে ব্যাংকটিকে নিয়োগ দেয় গ্রুপটি। কোন বিজ্ঞাপন ও চাকরির পরীক্ষা ছাড়াই মোটা অংকের অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়া চিহ্নিত লোকবলের সংখ্যা দাঁড়ায় ৮ হজার ৩৪০ জনে। নিয়োগকৃত এসব কর্মকর্তা কর্মচারির মধ্যে অনেকই ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে ব্যাংকে যোগদান করে। ইতোমধ্যে অনেক ভুয়া সার্টিফিকেটধারিকে চাকরিচ্যূত করা হয়েছে। ইসলামী ব্যাংকে ভূয়া সনদ ও অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। অবৈধদের মধ্যে যারা এখনও ব্যাংকে রয়েছেন তাদের হাতে ভোল্ট ও ক্যাশ কাউন্টার থাকায় নিরাপত্তা নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
# ইসলামী ব্যাংকের ফেসবুক পেজ হ্যাক, বড় ক্ষতির হুমকি
# অবৈধদের পেছনে ৭ বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা
# এস আলমের নিয়োগকৃতদের ঘানি টানতে বিপাকে ব্যাংকটি
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত বছরের আগস্টে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ব্যাংকটি এস আলমের লুটপাটের বিষয়টি সামনে আসে। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা না-বেনামে ব্যাংক থেকে নিয়ে যায় এস আলম। আর ভুয়া নিয়োগে হাতিয়ে নেয় কয়েকশ’ কোটি টাকা। আর সিভির বাক্স বসিয়ে চট্টগ্রামের পটিয়ার লোক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হয় অযোগ্যদের। তাদের যোগ্যতা পুনঃমূল্যায়নের জন্য সম্প্রতি ব্যাংকের পক্ষ থেকে বিশেষ দক্ষতা যাচাই পরীক্ষা নেওয়া হয়। যা বয়কট করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষের অবাধ্যতা প্রকাশ করে প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মকর্তা। তারা ব্যাংকের বিরুদ্ধে নানা অপপ্রচার করে সংবাদ সম্মেলন করছে এবং বর্তমান ম্যানেজমেন্টকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে শুক্রবার (৩ অক্টোবর) ভোরে তারা ব্যাংকের ফেসবুক পেইজ হ্যাক করে। কতিপয় সন্ত্রাসীর ইন্ধনে তারা এসব কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তারা ক্যাশ কাউন্টার ও ভোল্টে আক্রমণ করতে পারে এমন শঙ্কা ঘনীভূত হয়েছে। যার নিরাপত্তা নিয়ে চাপে রয়েছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, বিগত বছরগুলোতে শুধুমাত্র চট্টগ্রামের লোক নিয়োগ দেওয়ায় অনেকটা আঞ্চলিক ব্যাংকে পরিণত হয় আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন এই ব্যাংকটি। তারা অফিসে সব সময় চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলত। বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা নিজেদের পরিবর্তন করেনি বরং দিন দিন তাদের অশোভন আচরণ আরও বেড়েছে। তাদের অদক্ষতা ও দুর্ব্যবহারের ফলে গ্রাহক সেবার মান চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গ্রাহক সেবায় ইসলামী ব্যাংকের যে সুনাম ছিল তা তলানিতে নেমে যায়। তাদের ভাষা বুঝতে না পারা এবং সেবার মান নিম্ন হওয়ায় গ্রাহকদের মাঝে চরম অসন্তোষ সৃষ্টি হয়। এস আলমের নিয়োগকৃত এসব কর্মকর্তার বেশিরভাগেরই পেশাগত দক্ষতা ছিলনা। তারা এস আলমের ক্ষমতা দেখিয়ে কলিগদের সাথে দুর্ব্যবহার ও ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা না মেনে খেয়াল খুশিমত চলতেন। নিজেদের পছন্দমত চট্টগ্রাম অঞ্চল ও সুবিধাজনক জায়গায় বদলি করতে বাধ্য করত। ম্যানেজার বা ঊর্ধ্বতন কেউ তাদের নিয়মের মাঝে আনতে চাইলে তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে পোস্টিং বা চাকরি হুমকির মধ্যে ফেলত। তাদের ক্ষমতা ও ঔদ্ধত্বের কারণে আতংকের মাঝে থাকত সবাই।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চাকরিচ্যুত এক কর্মকর্তা জানান, আমি কুড়িগ্রামের রকমারি শাখায় কর্মরত ছিলাম। আমাকে কারণ ছাড়া কর্মচ্যুত করা হয়েছে। আমাদের অনেকে এখনও রয়েছেন। তারা চাকরি হারাতে পারেন। তারা তাদের মত চেষ্টা করছেন। কিন্তু চাকরিচ্যুতকে কেন্দ্র করে কিছু ঘটলে তার দায় আমরা নিব না।
সূত্র জানায়, এস আলমের নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা ব্যাংকের ম্যানেজার ও জোনাল হেড সহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে আতংকের মাঝে রাখত। জাতীয় নির্বাচনের পর তারা এস আলম সহ আগের যায়গায় ফিরে আসবে বলে এখনও হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। অথচ এস আলমের অবৈধ নিয়োগ দেওয়া এসব কর্মকর্তাদের পিছনে বছরে ব্যাংকের ক্ষতি প্রায় ১৫০০ কোটি টাকারও বেশি। সেই হিসেবে ৭ বছরে প্রায় ১০ হজার কোটি টাকার বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যাংকটি। একদিকে ব্যাংকের একলাখ কোটি টাকার উপরে লোপাট অন্যদিকে ব্যাংকের ঘাড়ে অবৈধ নিয়োগকৃত এতবড় খরচের বোঁঝা টেনে সামনে এগিয়ে যাওয়া ইসলামী ব্যাংকের জন্য প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স, বাংলাদেশ (এবিবি) এর চেয়ারম্যান ও সিটি বাংকের ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মাসরুর আরেফিন বলেন, এস আলম একাই পুরো ব্যাংক খাত ধ্বংস করেছে। তার ঘানি টানতে হচ্ছে সবাইকে। ইসলামী ব্যাংক ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য কাজ চলমান। ব্যয় কমাতে পারলে তা দ্রুত আগের অবস্থানে ফিরতে পারবে।
এদিকে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেডের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ হ্যাক করা হয়েছে। একই সঙ্গে ফেসবুক পেজের প্রোফাইল ও কভার ছবি চেঞ্জ করে একটি হুমকিপূর্ণ বার্তা প্রকাশ করা হয়েছে। শুক্রবার ভোর ৫টা ৪২ মিনিটে ব্যাংকটির অফিসিয়াল পেজের এক পোস্ট থেকে বিষয়টি নিশ্চিত করেছে হ্যাকার গ্রুপ। পেজটির নাম পরিবর্তন করা হয়নি। এর প্রোফাইল ও কভার ফটো পরিবর্তন করে হ্যাকার গ্রুপটির ছবি দেওয়া হয়েছে।
হ্যাকার গ্রুপ দাবি করেছে, ব্যাংকের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং খুব শিগগিরই তাদের ফেসবুক পেজ ও ওয়েবসাইটে সাইবার আক্রমণ চালানো হবে।
আমিনুল ইসলাম নামের একজন গ্রাহক তার ফেসবুক পোস্টে বলেন, পটিয়ার অবৈধ নিয়োগপ্রাপ্তরা চাকরি রক্ষার আন্দোলন করেন কিন্তু আপনাদের ডাকাত সর্দার এস আলম যে ব্যাংক থেকে ৮০ হাজার কোটি টাকা পাচার করেছে তা ফিরিয়ে আনার আন্দোলন করেন না কেন?
ইসলামী ব্যাংকের পাবলিক রিলেশন ও ব্র্যান্ডিং বিভাগের প্রধান নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্রোহী কর্মকর্তাদের হাতে এখন অনেক কিছু নিরাপদ নয়। তারা যেভাবে বিদ্রোহ করে ব্যাংকের নির্দেশনা আমান্য করেছে, তাতে তাদের কাছে ব্যাংকের ভল্ট বা ক্যাশ কাউন্টার কোনভাবেই নিরাপদ নয়। এদের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে ব্যাংকের ঝুঁকি বাড়ার শঙ্কা রয়েছে।
প্রসঙ্গত, ১৯৮৩ সালের ১৩ মার্চ দক্ষিণ এশিয়ার প্রথম শরিয়াহভিত্তিক এই ব্যাংক প্রতিষ্ঠা লাভ করে। কিছু সৎ ও দক্ষ মানুষের হাত ধরে প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ব্যাংক খুব অল্প সময়ের মধ্যে বিপুল জনপ্রিয়তা পায়। পর্যায়ক্রমে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এই ব্যাংকের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারী, আমানতকারী, বিনিয়োগ গ্রাহক, বিশেষ গ্রাহক কিংবা শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে। সৎ পরিচালনা পর্ষদ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের সততার কারণে আমানত-বিনিয়োগে একপর্যায়ে শীর্ষ অবস্থান লাভ করে ব্যাংকটি। এটি দেশের বেস্ট ব্যাংক, বেস্ট ইসলামিক ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউশন হিসেবে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অনেকবার অ্যাওয়ার্ড লাভ করে।