পুঁজিবাজারের তালিকাভুক্ত বিমা কোম্পানি যমুনা লাইফের সিইও হতে মরিয়া হয়ে ওঠেছেন আপদমস্তক দুর্নীতিবাজ অসৎ কর্মকর্তা অজিত চন্দ্র আইচ। বিমা খাতে একের পর এক অপরাধে জড়িয়েছেন তিনি। কর্মজীবনে প্রতিটি কদমে দিয়েছেন অদক্ষতা এবং অযোগ্যতার পরিচয়। অনিয়ম-দুর্নীতি, বিমা আইন লঙ্ঘন, জাল-জালিয়াতি এবং আর্থিক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকার প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও যমুনা লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হতে তৎপর চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
অজিত চন্দ্র আইচের আগের কর্মস্থল ন্যাশনাল লাইফ, সন্ধানী, প্রগ্রেসিভ থেকে শুরু করে সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিসহ প্রতিটি প্রতিষ্ঠানে দিয়েছেন অযোগ্যতা এবং ব্যর্থতার পরিচয়। এতসব অনিয়ম, অপরাধের পরেও তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ)।
সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রধান নির্বাহী ছিলেন অজিত চন্দ্র আইচ। তাঁর সময়ে কোম্পানির বিভিন্ন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে কোটি কোটি টাকা লেনদেন করা হয়, যা বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখিয়ে আত্মসাৎ করে পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা। প্রতিটি লেনদেনেই মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অজিতের অনুমোদন বা সহযোগিতা ছিল।
বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, সোনালী লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডে অজিত চন্দ্র আইচের মেয়াদকালে সংঘটিত হয় ৩৪৯.০৮ কোটি টাকার ভয়াবহ অর্থ আত্মসাতের ঘটনা। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে কোম্পানির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০২৩ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সময়ে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যরা আত্মসাৎ করেন। আত্মসাৎ চলাকালীন দীর্ঘ সময় সোনালী লাইফের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে অজিত চন্দ্র আইচ প্রত্যক্ষ সহযোগিতা করেন।
বিএফআইইউ এই অনিয়মের বিস্তারিত অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন আকারে বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) নিকট জমা দেয়। এবং অপরাধীদের ব্যাপারে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ প্রদান করেন।
আর্থিকখাতের এই তদন্তকারী সংস্থাটি বলছে, পরিচালনা পর্ষদ এককভাবে এত বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাৎ করতে পারত না, যদি মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা সহযোগিতা না করত। ফলে অজিত চন্দ্র আইচ এই অর্থ আত্মসাতের দায় থেকে অব্যাহতি পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বীমা আইনের ৫০(১) ধারা অনুযায়ী গ্রাহক স্বার্থ ক্ষুন্ন করার দায়ে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নিয়ম থাকলেও, বিস্ময়করভাবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। বরং তাকে বীমা কোম্পানির সিইও “পুলে” অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যা বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আিইডিআরএ) নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আলোচনা-সমালোচনা। কেউ কেউ বলছেন, এই ধরনের দুর্নীতিবাজ এবং অসৎ ব্যক্তিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে স্বয়ং নিয়ন্ত্রক সংস্থাই।
ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সেও অনিয়ম, আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ রয়েছে অজিতের চন্দ্রের বিরুদ্ধে। জানা যায়, কোম্পানিটিতে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগে গভীর রাতে তাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যায় মতিঝিল থানা পুলিশ।
অজিত চন্দ্রের বিরুদ্ধে এর আগে সন্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্সে থাকাকালীন একই ধরণের অনিয়ম ও জালিয়াতিতে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠে। দায়িত্বে থাকাকালীন তিনি প্রতিষ্ঠানের প্যাড ব্যবহার করে নিজস্ব স্বাক্ষরে বিভিন্ন অনুমোদন ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করেছেন, যা অফিসের নিয়ম-বিধির চরম লঙ্ঘন। ভুয়া ছাড়পত্র, যোগ্যতা না থাকা কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার এবং প্রশাসনিক কারচুপিসহ নানা দুর্নীতির চিত্র পাওয়া গেছে তার সময়ে।
কর্মজীবনে নানা ব্যর্থতায় দীর্ঘদিন ছুটিতে থেকে কার্যত নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন অজিত, এর সঙ্গে যুক্ত হয় অদক্ষতা। এ সুযোগে একটি সংঘবদ্ধ চক্র কোম্পানির ভেতরে গভীর ষড়যন্ত্র চালিয়ে প্রোগ্রেসিভ লাইফে ব্যাপক আর্থিক ক্ষতি সাধন করে। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো বলছে, প্রোগ্রেসিভ লাইফের পতনের জন্য অজিতের দুর্বল নেতৃত্ব ও দায়িত্বহীনতাই মূলত দায়ী। শুধু তাই নয়, অবৈধ ও নিয়মবর্হিভূতভাবে কোম্পানিটি থেকে উৎসব ভাতা বাবদ প্রায় ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ করেন অজিত।
এসব বিষয়ে জানতে অজিত চন্দ্র আইচকে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তার ব্যবহৃত হোয়াটসঅ্যাপে এসএমএসের মাধ্যমে জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোন জবাব দেননি।