চট্টগ্রাম বন্দরে চলমান অচলাবস্থা দ্রুত নিরসন করে স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফেরার আহ্বান জানিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (ইউরোচেম্বার বাংলাদেশ)। সংস্থাটি সতর্ক করে বলেছে, দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা দেশের রপ্তানি খাত, জাতীয় অর্থনীতি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের ভাবমূর্তির ওপর গুরুতর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
শনিবার (৭ ফেব্রুয়ারি) দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউরোচেম্বার জানায়, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে কাজ বন্ধ থাকায় রপ্তানি কার্যক্রম কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এতে হাজার হাজার কনটেইনার বন্দরের টার্মিনাল, বেসরকারি ডিপো ও জাহাজে আটকে আছে এবং নির্ধারিত রপ্তানি সময়সূচি ভেঙে পড়ছে।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের মোট আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ৯০ শতাংশের বেশি পরিচালনা করে এবং রপ্তানিনির্ভর শিল্পগুলোর প্রধান প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। স্বাভাবিক সময়ে এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হলেও সাম্প্রতিক কর্মবিরতির কারণে কনটেইনার চলাচল প্রায় সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে।
ইউরোচেম্বার জানায়, বর্তমানে বন্দরের বিভিন্ন স্থানে আটকে থাকা প্রায় ১৩ হাজার কনটেইনারে আনুমানিক ৬৬ কোটি মার্কিন ডলারের রপ্তানি পণ্য আটকে আছে, যা পরিবহন বিলম্ব, অতিরিক্ত লজিস্টিক ব্যয় এবং রপ্তানিকারকদের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।
সংস্থাটির সদস্য প্রতিষ্ঠান এবং বাংলাদেশ থেকে পণ্য সংগ্রহকারী ইউরোপীয় ব্র্যান্ডগুলো পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। ইউরোচেম্বার মনে করে, নিরবচ্ছিন্ন ও পূর্বানুমানযোগ্য বন্দর কার্যক্রম রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা, লাখো মানুষের কর্মসংস্থান সুরক্ষা এবং ইউরোপসহ বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের একটি নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারী হিসেবে অবস্থান বজায় রাখতে অত্যন্ত জরুরি।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, দীর্ঘমেয়াদি অচলাবস্থা বৈশ্বিক ক্রেতাদের আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে, বিশেষ করে এমন সময়ে যখন আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো সময়মতো পণ্য সরবরাহ ও সরবরাহ ব্যবস্থার ঝুঁকি নিয়ে বাড়তি সতর্কতায় রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে ইউরোচেম্বার বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে—চট্টগ্রাম বন্দরের পূর্ণাঙ্গ ও স্বাভাবিক কার্যক্রম দ্রুত নিশ্চিত করা, জাতীয় অর্থনৈতিক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে চলমান বিরোধগুলো গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা এবং দীর্ঘমেয়াদি দক্ষতা ও প্রতিযোগিতাশীলতা বাড়াতে বন্দর আধুনিকায়ন কার্যক্রম জোরদার করা।
ইউরোচেম্বার জানায়, তারা দেশের বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও অবকাঠামো শক্তিশালীকরণে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং একটি স্থিতিশীল ও দক্ষ বন্দর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনদের সঙ্গে কাজ করতে প্রস্তুত।
সংস্থাটির তথ্যমতে, ২০২৪–২৫ অর্থবছরে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে ৮ লাখ ৩১ হাজারের বেশি রপ্তানি কনটেইনার পরিবহন হয়েছে, যার মোট মূল্য ছিল ৪২ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশের মোট রপ্তানির প্রায় ৮০ শতাংশ আসে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত থেকে, যা দেশকে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোশাক রপ্তানিকারক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশি পোশাক রপ্তানির পরিমাণ সম্প্রতি ৯ দশমিক ৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বন্দরে ফের ধর্মঘটের ঘোষণা
এর মধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) বিদেশি প্রতিষ্ঠানের কাছে ইজারা না দেওয়ার দাবিসহ চার দফা দাবিতে ফের অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদ। আগামীকাল রোববার (৮ ফেব্রুয়ারি) সকাল ৮টা থেকে এ কর্মসূচি শুরু হবে।
শনিবার দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন সংগঠনটির সমন্বয়ক মো. ইব্রাহীম খোকন। তিনি জানান, এনসিটি ইজারা প্রক্রিয়া বাতিলের সুস্পষ্ট সরকারি ঘোষণা না আসা পর্যন্ত কর্মসূচি চলবে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও দাবি করা হয়—চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান এস এম মনিরুজ্জামানকে পদ থেকে প্রত্যাহার, আন্দোলনে অংশ নেওয়া শ্রমিক-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে নেওয়া বদলি, চার্জশিট, সাময়িক বরখাস্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা বাতিল এবং শ্রমিক নেতাদের বিরুদ্ধে সব ধরনের মামলা ও আইনি পদক্ষেপ প্রত্যাহার করতে হবে।
এর আগে গত ৩১ জানুয়ারি থেকে ৫ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ধাপে ধাপে কর্মবিরতির কারণে বন্দরের আমদানি ও রপ্তানি কার্যক্রম, কনটেইনার হ্যান্ডলিং এবং জাহাজ চলাচল ব্যাহত হয়। ৫ ফেব্রুয়ারি নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেনের আশ্বাসে দুই দিনের জন্য কর্মবিরতি স্থগিত করা হলেও পরে আন্দোলনকারী ১৫ জন শ্রমিক নেতার বিরুদ্ধে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ তদন্তের উদ্যোগ নেওয়ায় আবারও উত্তেজনা ছড়ায়।